নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাইয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে আহতদের হাসপাতালে দেখতে গিয়ে চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের ‘নো ট্রিটমেন্ট, নো রিলিজ’ (না চিকিৎসা, না ছাড়পত্র) নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, এমন দাবি করলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলাম।২৩শে ফেব্রুয়ারি, রোববার আদালতে পূর্বনির্ধারিত বিষয়ে শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন অফিসের সম্মেলন কক্ষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের এমন দাবি করেন তিনি।যদিও এ বিষয়ে বিডি ডাইজেস্টের তথ্যানুসন্ধান বলছে ভিন্ন কথা।চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের দপ্তর থেকে দেওয়া একটি অফিস আদেশের কপি বিডি ডাইজেস্টের হাতে এসে পৌঁছেছে। ১৮ই জুলাই, ২০২৪ইং তারিখে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. অং সুই প্রু মারমা সাক্ষরিত অফিস আদেশটির স্মারক নং- চমেকহা/প্রশাসন/শা-১/২০২৪/৮৫৪৬।অফিস আদেশটিতে বলা হয়েছে, “১৮/০৭/২০২৪ইং তারিখে জুম মিটিং এর মাধ্যমে অনুষ্ঠিত সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কোটা আন্দোলনে আহত সকল রোগীকে হাসপাতাল হতে সকল প্রকার ঔষধ সরবরাহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোনো প্রকার ঔষধ বা অন্য কোন জিনিসপত্র রোগীদের বাহির হতে কিনতে দেওয়া যাবে না। চলমান পরিস্থিতিতে সার্জারী বিভাগ, অর্থোসার্জারী বিভাগ, নিউরোসার্জারী বিভাগ, ক্যাজুয়ালিটি বিভাগ ও জরুরী বিভাগে একজন সিনিয়র ডাক্তারের মাধ্যমে প্রতিদিন সান্ধ্যকালীন রাউন্ড নিশ্চিত করতে হবে।আদেশটিতে আরও বলা হয়, “এ প্রেক্ষিতে উপরোক্ত বিভাগসমূহে যথাযথভাবে নির্দেশনা মেনে রোগীদের চিকিৎসা প্রদান নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ করা হলো। জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হলো।এই অফিস আদেশটির অনুলিপি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়েও সরবরাহ করা হয়।অফিস আদেশটির মাধ্যমে এটা সুস্পষ্ট যে, শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে হতাহতদের চিকিৎসা সেবা না দেওয়ার যে দাবিটি করা হয়েছে, তা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দায়িত্বরত একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সাথে প্রতিবেদকের কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলামের বক্তব্যটি বিষয়টি তাদেরকেও অবাক করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আদৌ কাউকে চিকিৎসা না দেওয়ার মত মন্তব্য করতে পারেন কিনা, এ নিয়ে তারা নিশ্চিত নন।রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি জনমানসকে আন্দোলিত করেছে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাকর্মীর চিকিৎসার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন, অর্থ সাহায্য ছাড়াও স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নিয়েছিলেন, এসব অনেকেই জানেন।গণভবনে বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উন্নত চিকিৎসার জন্য যদি কোনো সহযোগিতা লাগে, সেটিও সরকার দেখবে বলে আশ্বস্ত করেছিলেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বরাতে জানা যায়। বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর অসুস্থতাকালীন সময়ে একাধিকবার চিকিৎসার খোঁজ-খবর নিয়েছিলেন বলে সংবাদে প্রকাশ। বিএনপিপন্থী সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনেক নেতৃবৃন্দ দল-মতের উর্ধ্বে শেখ হাসিনার কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা/অনুদান পেয়েছিলেন।
এদিকে, চিকিৎসক সমাজেও প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের মন্তব্যটি নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ইতিমধ্যে অনেক চিকিৎসকই লিখছেন।ডা. এহতেশাম লিখেছেন: শেখ হাসিনা ‘নো ট্রিটমেন্ট, নো রিলিজ’ কথাটি বলেছেন কিনা আমি শিওর না। তবে উনাকে যতটা দেখেছি, উনি কাউকে চিকিৎসা দিতে নিষেধ করবেন, তেমন মানুষ উনি নন। উনাকে পছন্দ করুন আর না করুন, উনার সম্পর্কে সবাই একবাক্যে কথাটা স্বীকার করবেন। উনার উপর গ্রেনেড হামলাকারীর বাড়িতেও উনি গেছেন পুত্রশোকে স্বান্তনা দিতে। তাছাড়া, উনি যদি এই কথাটা বলেও থাকেন, সেটার ভিন্ন অর্থ রয়েছে চিকিৎসাবিদ্যার ক্ষেত্রে।
এই চিকিৎসক আরও লেখেন, চিকিৎসাবিদ্যায় ‘নো ট্রিটমেন্ট, নো রিলিজ’-হলো ইংরেজি ফ্রেইজ। এর অর্থ হচ্ছে, রোগীর হাত ততক্ষণ পর্যন্ত ছেড়ো না, যতক্ষণ না তার চিকিৎসা সম্পন্ন হচ্ছে, শারীরিক ও মানসিকভাবে সে রোগমুক্ত হচ্ছে। পরিপূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগপর্যন্ত তাকে সেবা দিয়ে যাও। ‘নো ট্রিটমেন্ট, নো রিলিজ’ এর অর্থ কাউকে চিকিৎসা বঞ্চিত করো, পাশাপাশি তাকে ছাড়পত্র দিওনা- এমন যদি কেউ মনে করে থাকেন, তাহলে তার উচিৎ কোনো ইংরেজি শিক্ষকের শরণাপন্ন হওয়া। এরপর নিজের মস্তিষ্কের চিকিৎসা করানো।