
নতুন বছরে প্রথম দিনে হিমশিম খেতে পারে বই বিতরণের সরকার
চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ
জানুয়ারিতে আসন্ন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণের জন্য বই ছাপাতে হিমশিম খেতে হবে সরকারকে।নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে দেড় মাস বাকি। অন্যান্য বছর এই সময়ে চাহিদার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বই পৌঁছে যেত শিক্ষা অফিসে। তবে এবার চট্টগ্রামে ৪০ লাখ নতুন বইয়ের চাহিদার বিপরীতে একটিও আসেনি। মুদ্রণ কাজ দেরিতে শুরু হওয়ায় বছরের শুরুতেই সব শিক্ষার্থী হাতে নতুন বই পাবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের শুরুতেই সব বই হাতে পাবে না শিক্ষার্থীরা। দেশের উদ্ভুত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, পাঠ্যবইয়ে সংযোজন ও বিয়োজন এবং পাঠ্যবই ছাপানোর কার্যাদেশ দিতে দেরি হওয়াই এর মূল কারণ।
চট্টগ্রাম জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অন্যান্য বছর সাগরিকা প্রিন্টার্স, অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠান বই ছাপালেও এবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বই ছাপানোর কাজ করছে তা জানাতে পারেনি কেউ।জানা গেছে, প্রতিবছর সাধারণত জুলাই-আগস্ট থেকে পাঠ্যবই ছাপার কাজ পুরোদমে শুরু হয়। অক্টোবর থেকে শিক্ষা অফিসে চাহিদা অনুসারে বই পৌঁছাতে শুরু করে। এরপরও ডিসেম্বরের মধ্যে শতভাগ বই দেওয়া সম্ভব হয় না। এবার নভেম্বরে এসে সবমাত্র শুরু হয়েছে বই ছাপার কাজ। যেভাবে কাজ এগোচ্ছে তাতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ছাপার কাজ শেষ করা নিয়ে কর্মকর্তারা সন্দিহান।জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রামের ৪ হাজার ৬৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৮ লাখ ৪৫ হাজার ২৫৮ জন শিক্ষার্থী নতুন বই পাবে। এবার নতুন বইয়ের চাহিদা রয়েছে ৪০ লাখ ৬৬ হাজার ১৯৪টি। যেখানে গতবার বইয়ের চাহিদা ছিল ৪৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫৯০টি। তবে গতবারের চেয়ে এবার বইয়ের চাহিদা কমেছে প্রায় ৪ লাখ। যদিও এতো সংখ্যক বইয়ের চাহিদা কমার কারণ নির্দিষ্ট করে জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।এদিকে, চট্টগ্রামের স্কুলগুলোতে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় লেখা বইয়ের চাহিদা রয়েছে ৩০৮টি। যা চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এবং নগরের পাঁচলাইশ থানা শিক্ষা অফিসের আওতাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা এবং গারো সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মাতৃভাষায় লেখা বই পেয়ে থাকে।কবে নাগাদ চট্টগ্রামে বই আসবে এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এস এম আব্দুর রহমান সংবাদ কর্মীকে বলেন, ‘বই নিয়ে আমাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তেমন কোনো কথা হয়নি। এজন্য সঠিকভাবে বলতেও পারছি না এই মুহূর্তে। যতটুকু জেনেছি। এখনো প্রিন্টিংয়ের কাজ চলছে। তবে কবে নাগাদ আসবে তা সঠিক জানা নেই।এক প্রশ্নের জবাবে এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘পরিবর্তনের কারণে কিছুটা ধীরগতি হচ্ছে। যার কারণে এখনো পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের ভেতর আমরা বই পেয়ে যাবো।এ বিষয়ে জানতে চাইলে ন্যাশনাল কারিকুলাম অ্যান্ড টেক্সটবুক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক ড. রিয়াদ চৌধুরী গণমাধ্যমকর্মী কে বলেন, ‘প্রাথমিকে বই ছাপার কাজ শুরু হয়েছে। আমরা আশাবাদী নতুন বছরের শুরুর দিনে আমরা শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছাতে পারবো। কারণ মুদ্রণের সঙ্গে যারা জড়িত তারা আমাদেরকে পাঁচদিনের ভেতর বই ছাপানোর কাজ শেষ করে দিতে পারবে বলে জানিয়েছে। তাদের ক্যাপাসিটি এতো হাই। তাই সময়মত বই বিতরণ নিশ্চিত করতে আমরা আশাবাদী।এদিকে এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, গত জুন মাসে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বইয়ের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন শিক্ষাক্রম থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বইতে সামান্য পরিমার্জন শেষে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। আর চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি পুরনো শিক্ষাক্রমে চলছিল। ফলে তাদের বইতে সামান্য পরিমার্জন শেষে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর আগে ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ের চাহিদা চেয়ে জেলা উপজেলা শিক্ষা অফিসে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে বইয়ের চাহিদা পাঠানোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এরপর সেপ্টেম্বরের শেষদিকে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কারিগরি স্তরের পাঠ্যবইয়ের মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। পরবর্তীতে সময়ে অক্টোবরের ৩ তারিখ আবারও দরপত্র আহ্বান করে এনসিটিবি। ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত দরপত্রে অংশ নেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর তৃতীয় দফায় গত ১৭ অক্টোবর দরপত্র আহবান করা হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত দরপত্রে অংশ নেওয়ার সময় বেঁধে দেওয়া হয়।উল্লেখ্য, চলতি শিক্ষাবর্ষের জন্য গত বছর দেশে প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছেপেছে সরকার। তবে, পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের কারণে ২০২৫ সালের জন্য সরকারকে বই ছাপতে হবে ৪০ কোটি। ২০১০ সাল থেকে সরকার প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুর দিনেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক তুলে দিয়ে আসছে। সেই ধারায় ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারিতে আসন্ন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণের জন্য বই ছাপাতে হিমশিম খেতে হবে সরকারকে। তবে গত তিন বছরেও যথাসময়ে বই বিতরণ করা চ্যালেঞ্জ ছিল। ২০২২, ২০২৩ ও চলতি শিক্ষাবর্ষের অষ্টম ও নবম শ্রেণীর বই যথাসময়ে সরবরাহ করতে পারেনি। সব বইয়ের জন্য মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে এসব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের। এর আগে করোনা মহামারির কারণে ২০২১ সালেও পাঠ্যপুস্তক বিতরণ প্রক্রিয়ায় দেরি হয়েছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২২ সালে চালু করা পাঠ্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে ২০১২ সালের পাঠ্যক্রমে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে