শুক্রবার, এপ্রিল ৪, ২০২৫

লিবিয়ায় দালালের নির্যাতনে নিহত রাসেল! ক্ষোভে দালালের বাড়িতে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট!

 

নাসিরনগর(ব্রাহ্মণবাড়িয়া)প্রতিনিধি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ইতালি নেওয়ার কথা বলে দালালের খপ্পরে পড়ে রাসেল মিয়া নামে একজনের নিহতের খবর পাওয়া গেছে। নিহত রাসেল মিয়া উপজেলার ধরমণ্ডল ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের লাউছ মিয়ার ছেলে।

এ ঘটনায় পর থেকে দালাল লিলু মিয়ায় বাড়িতে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে।

পরিবারের দাবি, ২১ ফেব্রুয়ারি লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের লোকজন বিষাক্ত ইনজেকশন প্রয়োগ করে রাসেলকে হত্যা করে। ২২ ফেব্রুয়ারি এক প্রবাসীর মাধ্যমে রাসেলের মৃত্যুর সংবাদ জানতে পারে পরিবার।

জানা যায়, পরিবারের অস্বচ্ছলতাকে দূর করার জন্য ২০২৪ সালে পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে রাসেল পাড়ি জমায় লিবিয়ায়। স্থানীয়দের দাবী দালাল লিলু মিয়ার সাথে কথা ছিল লিবিয়া থেকে রাসেলকে ইতালি পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝে যে এক নিষ্ঠুর ফাঁদ অপেক্ষা করছিল, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। অবশেষে মাফিয়া চক্রের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে নিভে গেল এক তরুণ প্রাণ। তার মৃত্যুর খবরে এখন পরিবারে চলছে শোকের মাতম।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে রাসেল সবার বড়। ২০২৪ সালের প্রথম দিকে, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে পরিবারের শেষ সম্বল পৈত্রিক ভিটা বিক্রি করে ১৫ লাখ টাকা তুলে দেন একই গ্রামের মানব পাচারকারী লিলু মিয়ার হাতে। কথা ছিল লিবিয়া থেকে তাকে ইতালি পাঠানো হবে। কিন্তু বিদেশের মাটিতে পৌঁছে তার কপালে জোটে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। সেখানে তাকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয় লিবিয়ার একটি স্থানীয় দালাল চক্রের হাতে। এর পরই শুরু হয় দুঃস্বপ্নের অধ্যায়। মাফিয়া চক্র রাসেলকে নির্যাতন করে একাধিকবার ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন ৩০ লাখ টাকা। সবশেষ আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করে চক্রটি। কিন্তু টাকা না দেওয়ায় ইনজেকশন প্রয়োগ করে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগী পরিবারের।

নিহতের পিতা লাউছ মিয়া বলেন, আমার জীবনের শেষ সম্বল বসত ভিটা ও ফসলি জমি বিক্রি কইরা কয়েক ধাপে ৫০ লাখ টাকা দিছি। আরও টাকা চাইত দিতাম। কিন্তু পরবর্তীতে টাকা দিতে না পারায় আমার ছেলেকে হত্যা করছে দালাল লিলু মিয়া ও মাফিয়া চক্র।

রাসেলের মৃত্যুর বিষয়ে কথা বলতে দালাল লিলু মিয়ার বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার পরিবার ও সে পলাতক আছে। তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। তবে সেখানে তার ঘর ভাঙা ভাঙি, টিনের চালা ও বেড়া খুলে নিতে দেখা যায় কয়েকজনকে।

নিহতের চাচা ফখরুল ইসলাম জানান, রাসেলকে দালালরা নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছিল। সেখানে সর্বশেষ সাড়ে নয় লক্ষ টাকা চাওয়া হয়, না দিতে পাড়ায় মেরে ফেলেছে। এখন লাশ ফেরত দিতে দশ লক্ষ টাকা দাবি করছে। এখন কাকে টাকা দিব আমরা? টাকা দিলেও যে লাশ দিবে তার কি নিশ্চিত আছে?

ভাংচুরের বিষয়ে তিনি বলেন, কারা এগুলো করছে আমরা জানি না। তবে দালালের উপর মানুষের অনেক ক্ষোভ রয়েছে।

ধরমণ্ডল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, রাসেলকে বাঁচাতে তার পরিবার প্রায় ৫০ লাখ টাকা দিয়েছে। কিন্তু টাকা দিয়েও বাঁচাতে পারেনি। যারা মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। রাসেলের মতো আর কোনো তরুণ যেন অকালে প্রাণ না হারায়।

এ দিকে লিলু মিয়ার বাড়ি ধংসস্তুুপে পরিনত হয়েছে।
দিনে দুপুরেই চলছে ধংসযঞ্জ। ভয়ে আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াচ্ছে লিলু মিয়া ও তার পরিবার।
ধরমন্ডল ৪ নং ওয়ার্ডের স্থানীয় কয়েকজনের সাথে কথা বললে তারা জানায়,দূরবর্তী ৭ নং ওয়ার্ড থেকে লোকজন এসে প্রকাশ্যে ভাংচুর ও লুটপাট করছে।
ধংসযঞ্জের ক্ষয় ক্ষতির পরিমান দুই কোটি টাকারও বেশী।

নাসিরনগর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. খাইরুল আলম বলেন, নিহতের পরিবারের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।প্রকাশ্যে ভাংচুর ও লুটপাটের বিষয়ে নাসিরনগর থানার পুলিশ উপপরিদর্শক (এস আই)নূরে আলম বলেন সেখানে থানা থেকে অফিসার পাঠানো হয়েছে।

নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীনা নাসরিন বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। যারা মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

সর্বাধিক পঠিত