শুক্রবার, এপ্রিল ৪, ২০২৫

ফেসবুকের প্রেমের ফাঁদে ধরা ‘বাঘা বাঘা’ নেতা: ধরা পড়লো চাঞ্চল্যকর প্রতারক

ফেসবুকের প্রেমের ফাঁদে ধরা ‘বাঘা বাঘা’ নেতা: ধরা পড়লো চাঞ্চল্যকর প্রতারক

চট্টগ্রাম রিপোর্টার:

চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিস্ময়কর ও নজিরবিহীন প্রতারণা কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়েছে। যেখানে এক তরুণী সেজে, প্রেমের অভিনয় করে, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রেমের নামে ব্ল্যাকমেইল, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং মামলা-জামিন বাণিজ্যের অভিযোগে অবশেষে ধরা পড়েছে সেই ব্যক্তি—যে আসলে কোনো তরুণী নয়, বরং ২৬ বছর বয়সী যুবক জুবাইরুল হক জিয়ান।

এই প্রতারণা এতটাই সুপরিকল্পিত ছিল যে, চট্টগ্রামের অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদও সহজেই এই ফাঁদে পা দিয়েছেন। শুধু ছাত্রলীগ বা যুবলীগের নেতারাই নন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একজন নেতা, মহানগরের দুই যুবলীগ নেতা, সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের দুই নেতা, মহানগর ছাত্রলীগের এক সম্পাদকীয় পদধারী নেতা এবং সাতকানিয়া উপজেলা যুবলীগের এক নেতাও জিয়ান নামের এই প্রতারকের প্রেমের চক্রে আটকা পড়েন।

তবে বিষয়টি এখানেই থেমে থাকেনি। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, জিয়ান শুধু প্রেমের ফাঁদ পেতে ব্ল্যাকমেইল করেই থামেননি। তিনি পুলিশ প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিএনপি-জামায়াত নেতাদের মামলায় ফাঁসানোর কাজে জড়িত ছিলেন এবং সেই মামলার জিম্মিদশা কাজে লাগিয়ে টাকা কামাতেন। শুধু তাই নয়, তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করিয়ে ফাঁসানোর কৌশলেও পারদর্শী ছিলেন।

শেষ পর্যন্ত পুলিশের গোপন অভিযানে ধরা পড়েছেন জুবাইরুল হক জিয়ান, কিন্তু তার এই দীর্ঘ প্রতারণার ইতিহাসে একাধিক রহস্যময় মোড় রয়েছে। কীভাবে তিনি এত বড় চক্র গড়ে তুললেন? কে কে এই প্রতারণার শিকার হলেন? কীভাবে এতদিন তিনি ধরা পড়েননি? অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ।

প্রথমে জিয়ান তার প্রতারণার পরিকল্পনা সাজায় ফেসবুকে ভুয়া পরিচয় তৈরি করার মাধ্যমে। তিনি চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাতের ম্যানেজিং ডিরেক্টর জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ের ছবি ব্যবহার করে একটি নকল ফেসবুক আইডি খোলেন। তারপর ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকেন।

একের পর এক রাজনৈতিক নেতার ইনবক্সে ‘বন্ধুত্বের অনুরোধ’ পাঠাতে থাকেন তিনি। কিছুদিন আলাপ চালানোর পরই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। নেতারা ভুলেই যান, তারা আসলে একজন ভুয়া আইডির সঙ্গে কথা বলছেন।

কিছুদিনের মধ্যেই সেই আলাপ রূপ নেয় গভীর প্রেমে। রাতভর মেসেঞ্জারে প্রেমালাপ, আবেগঘন কথা, এমনকি ভিডিও কলে কথা বলার দাবিও উঠতে থাকে। এখানে আরও এক ধাপ এগিয়ে যায় প্রতারণার খেলা—ভিডিও কলে কথা বলার সময় জিয়ান তারই এক তরুণী আত্মীয়কে ব্যবহার করতেন, যাতে নেতারা কোনো সন্দেহ না করেন।

নেতারা যখন বিশ্বাস করে বসতেন যে তারা সত্যিকার অর্থেই জিপিএইচ ইস্পাতের মালিকের মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছেন, তখনই আসল ফাঁদ পাতা হতো। ধীরে ধীরে নানান অজুহাতে টাকা দাবি করা হতো—”আমার ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য একটু টাকা পাঠাতে পারবে?”, “আমি তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চাই, কিন্তু কিছু ফান্ডের দরকার।”, “আমার এক আত্মীয় বিপদে আছে, একটু সাহায্য করো না?”।

নেতারা টাকা দিতে না চাইলে তখনই দেখানো হতো প্রেমালাপের স্ক্রিনশট ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি।

এভাবে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় জিয়ান। বিকাশ, নগদ এবং ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে টাকা পাঠানো হতো। কিছু নেতার কাছ থেকে পাওয়া গেছে স্ক্রিনশট লেনদেনের প্রমাণ।

তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, শুধু রাজনৈতিক নেতারাই নন, প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাও এই ফাঁদে পা দিয়েছিলেন।

প্রেমের ফাঁদ ছাড়াও পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যদের সঙ্গে মিলে প্রতারণার আরও এক বড় জাল বিস্তার করেছিলেন জিয়ান। তিনি বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করিয়ে ফাঁসানোর কাজ করতেন। এরপর সেই নেতাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতেন মামলা ম্যানেজ করার নাম করে।

২০২০ সালের ঈদ উল ফিতরের সময় সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার এক কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার সময় ভুল করে জিপিএইচ ইস্পাতের মালিকের মেয়ের ছবি বসিয়ে সেই ভিডিও কলের স্ক্রিনশট সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে দেন জিয়ান।

এই ছবি দেখেই প্রথমবার সন্দেহ হয় পুলিশের। এরপর তদন্ত শুরু হয়। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে—জিয়ান আসলে ছদাহা ইউনিয়নের ছৈয়দাবাদ এলাকার বাসিন্দা। তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং আগেও প্রতারণার দায়ে জেলে গিয়েছিলেন। নানা ধরনের চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ছিল।

সাতকানিয়া সার্কেলের এএসপি হাসানুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে জিয়ানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়—তিনটি মোবাইল ফোন, পাঁচটি সিম কার্ড এবং একাধিক বিকাশ লেনদেনের রেকর্ড।

জিয়ানের প্রেমের ফাঁদে ধরা পড়েছেন—আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতা, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা, সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের দুই নেতা, চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের দুই নেতা এবং মহানগর ছাত্রলীগের এক সম্পাদকীয় পদধারী নেতা।
তদন্তে দেখা গেছে, তারা সকলেই মেসেঞ্জারের ইনবক্সে গভীর প্রেমালাপে জড়িত ছিলেন।

জিয়ান গ্রেপ্তার হওয়ার পর চট্টগ্রামের রাজনৈতিক মহলে এখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক নেতাই ভাবছেন, “আমার চ্যাটের স্ক্রিনশট ফাঁস হবে না তো?” সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পুলিশ এখন আরও গভীরে তদন্ত চালাচ্ছে। আরও নতুন তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে

সর্বাধিক পঠিত