
শফিকুর রহমান-কক্সবাজার প্রতিনিধি:
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে দিন দিন অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। মাদক পাচার, হত্যা, অপহরণ, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধে ক্যাম্প এলাকা অশান্ত হয়ে উঠছে। এরই মধ্যে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা অর্ধেক কমিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবিক সংকট আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তহবিল সংকটের কারণে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) আগামী ১ এপ্রিল থেকে রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দেবে। বর্তমানে একজন রোহিঙ্গা মাসে ১২ দশমিক ৫০ ডলার মূল্যের খাদ্য সহায়তা পায়, যা কমিয়ে ৬ ডলারে আনা হবে।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, “গতকাল আমাকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে যে সহায়তা কমানো হবে এবং আজ আমি এ সংক্রান্ত চিঠি পেয়েছি। আমরা এখন যে পরিমাণ সহায়তা পাচ্ছি, তা যথেষ্ট নয়। নতুন কাটছাঁটের পরিণতি কী হবে, তা কল্পনা করাই কঠিন।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় অনেকেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ক্যাম্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় মাদক ব্যবসা, অপহরণ ও হত্যা বাড়ছে। এছাড়া, ক্যাম্পগুলোর অবস্থান সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় মাদক ও মানব পাচার সহজ হয়ে গেছে।
ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে কক্সবাজারের এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “ক্যাম্পে অপরাধ দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা দরকার।”
“মাদক ও মানব পাচারের ভয়াবহতা”
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো মাদক পাচার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার থেকে ইয়াবার বড় বড় চালান ক্যাম্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। ২০২৩ সালে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫০ লাখের বেশি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।
এছাড়া, ক্যাম্প থেকে নারী ও শিশু পাচারের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে একটি চক্র রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
“হত্যা ও অপহরণের ঘটনা বৃদ্ধি”
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ক্যাম্প এলাকায় শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। অনেক সময় অপহরণের ঘটনাও ঘটছে, যেখানে মুক্তিপণের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
“স্থানীয়দের উদ্বেগ ও সরকারের পদক্ষেপ”
রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে অপরাধ বাড়ায় স্থানীয় জনগণও আতঙ্কিত। কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার বাসিন্দারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের কারণে তাদের এলাকাগুলোও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
এদিকে, বিশ্লেষকরা বলছেন, খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ার ফলে রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে, যা অপরাধের মাত্রা আরও বাড়াতে পারে। সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত দ্রুত বিকল্প তহবিল সংগ্রহের ব্যবস্থা করা এবং ক্যাম্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।